বাংলা সাহিত্যে এমন কোনো কবির নাম খুঁজে পাওয়া কঠিন, যার কবিতায় বৈশাখের স্পর্শ নেই। প্রায় প্রত্যেক কবির কলমেই কোনো না কোনোভাবে উঠে এসেছে এই ঋতুর আবহ। একটি সাধারণ গবেষণায় দেখা যায়, বাংলা ভাষায় বৈশাখকে কেন্দ্র করে ছোট-বড় মিলিয়ে প্রায় ২৮৭৪টি কবিতা রচিত হয়েছে। আর যেসব কবিতায় পরোক্ষভাবে পহেলা বৈশাখের উপস্থিতি রয়েছে, সেগুলোর সংখ্যা তো আরও অনেক বেশি। বাংলা কবিতায় নববর্ষ যে বহুমাত্রিকতা ও বৈচিত্র্যে ধরা দিয়েছে, তা সত্যিই অন্য কোনো জাতির নববর্ষচিত্রে এত সমৃদ্ধভাবে প্রতিফলিত হয়নি।
বৈশাখ নিয়ে প্রথম রচিত কবিতার নির্দিষ্ট তথ্য জানা না গেলেও, কবি মুকুন্দরাম চক্রবর্তীর কাব্যে এর এক জীবন্ত ও স্পষ্ট চিত্র পাওয়া যায়। (১৫৪০–১৬০০ খ্রি.) সময়ে রচিত তাঁর কাব্যে বৈশাখকে তুলে ধরা হয়েছে তীব্র দাবদাহ ও প্রকৃতির উগ্র রূপের প্রতিচ্ছবি হিসেবে। এই রুদ্র প্রকৃতির প্রভাব কীভাবে সাধারণ মানুষের জীবনে, বিশেষ করে বাড়ি বাড়ি ঘুরে মাংস বিক্রি করা ফুল্লরার জীবনে বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছিল, তা তিনি অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে কাব্যে চিত্রিত করেছেন।

‘বৈশাখে অনলসম বসন্তের খরা।
তরুতল নাহি মোর করিকে পসরা
পায় পোড়ে খরতর রবির কিরণ।
শিরে দিতে নাহি আঁটে খুঞ্চার বসন
নিযুক্ত করিল বিধি সবার কাপড়।
অভাগী ফুল্লরা পরে হরিণের দুড়
পদ পোড়ে খরতর রবির কিরণ।
শিরে দিতে নাহি আঁটে অঙ্গের বসন
বৈশাখ হৈল আগো মোর বড় বিষ।
মাংস নাহি খায় সর্ব্ব লোকে নিরামিষ’
মাইকেল মধুসূদন দত্ত (১৮২৪–১৮৭৩ খ্রি.) বৈশাখকে দেখেছিলেন প্রকৃতির এক বহুরূপী উৎসব হিসেবে—যেখানে আছে পরিবর্তনের গতি, রূপের বৈচিত্র্য আর নতুনতার প্রাণচঞ্চলতা। বৈশাখী প্রকৃতির সেই ছন্দে তিনি অনুভব করেছিলেন মানবমনের গভীর মিল। আর সেই মিলের মধ্য দিয়ে দেখেছিলেন—মানুষের দৈনন্দিন জীবন, আবেগ, সুখ-দুঃখ আর প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তির অনুভূতিকে কীভাবে চিরন্তন ঋতুচক্র নীরবে প্রভাবিত করে।

‘ভূতরূপে সিন্ধুজনে গড়ায়ে পড়িল
বৎসর কালের ঢেউ, ঢেউর গমনে
নিত্যগামী রথ চক্র নীরবে ঘুরিল
আবার আয়ুর পথে হৃদয় কাননে
কত শত আশা লতা শুকায়ে মরিল
হায়রে কব তা কারে, কবিতা কেমনে
কি সাহসে আবার তা রোপিব যতনে
সে বীজ, যে বীজ ভূতে বিভল হইল।’

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮৬১–১৯৪১ খ্রি.) যেন সত্যিই বৈশাখের কবি। জন্মও তার এই মাসেই—হয়তো সেই কারণেই বৈশাখ তাকে টেনেছে বিশেষ আপন টানে। তার কবিতায় বৈশাখ বারবার ফিরে এসেছে বহুস্তরের প্রকাশ নিয়ে—সুরে ও ছন্দে, রুদ্রতা ও রুক্ষতায়, আবার জীবনের চিরচঞ্চল পরিবর্তনের অনুভবেও।
বৈশাখে তিনি যেমন দেখেছেন ধ্বংসের অগ্নি, তেমনি খুঁজে পেয়েছেন নতুন বছরের আশাজাগানিয়া আনন্দ। ‘বৈশাখ আবাহন’ কবিতায় তার সেই বহুমাত্রিক উপলব্ধির দীপ্ত প্রকাশ স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
‘এসো, এসো, এসো হে বৈশাখ
তাপসনিঃশ্বাসবায়ে মুমূর্ষুরে দাও উড়ায়ে
বৎসরের আবর্জনা দূর হয়ে যাক…
যাক পুরাতন স্মৃতি যাক ভুলে যাওয়া গীতি
অশ্রু বাষ্প সুদূরে মিলাক।’
‘বৈশাখ আবাহন’ বাংলা সাহিত্যে বৈশাখ নিয়ে লেখা সর্বাধিক গাওয়া কবিতা/গান। বৈশাখ নিয়ে সর্বাধিক পরিচিত ও পঠিত ছড়ার রচয়িতাও রবীন্দ্রনাথ; ছড়াটি হচ্ছে :
‘আমাদের ছোটো নদী চলে বাঁকে বাঁকে
বৈশাখ মাসে তার হাঁটু জল থাকে।’

বৈশাখকে রবীন্দ্রনাথ অবলোকন করেছেন রুদ্ররূপেও। কল্পনা কাব্যের ‘বৈশাখ’ কবিতায় রবীন্দ্রনাথের রুদ্র বৈশাখ ভিন্নমাত্রায় প্রতিফলিত হয়েছে রোচিষ্ণু মোহনীয়তায়-
‘হৈ ভৈরব, হে রুদ্র বৈশাখ,
ধুলায় ধূসর রুক্ষ উড্ডীন পিঙ্গল জটাজাল,
তপঃক্লিষ্ট তপ্ত তনু, মুখে তুলি বিষাণ ভয়াল
কারে দাও ডাক-
হে ভৈরব, হে রুদ্র বৈশাখ?’
রবীন্দ্রনাথ বৈশাখকে শুধু রুদ্র শক্তির রূপেই দেখেননি; তিনি লক্ষ্য করেছেন এর শুষ্ক, রুক্ষ ও কঠোর দিকও। এই রুক্ষ প্রকৃতির মুখোমুখি হয়ে তিনি শক্তির কাছে হয়েছেন নত, শান্তি ও প্রশান্তির প্রার্থনায় আরও গভীর হয়েছেন।

‘হৈ বৈরাগী, করো শান্তিপাঠ।
উদার উদাস কণ্ঠ যাক ছুটে দক্ষিণে ও বামে
যাক নদী পার হয়ে, যাক টলি গ্রাম হতে গ্রামে,
পূর্ণ করি মাঠ।’
বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম (১৮৯৯–১৯৭৬ খ্রি.)-এর জন্ম রবীন্দ্রনাথের মতো বৈশাখে না হলেও, স্বভাব ও কাব্যচেতনায় তিনি যেন বৈশাখেরই প্রতিরূপ—রুদ্র, অশান্ত আর তীব্র প্রাণশক্তিতে ভরপুর। সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে তিনি হয়ে ওঠেন বিপ্লবের কণ্ঠস্বর, নতুন সৃষ্টির উন্মাদনায় দীপ্ত এক সংগ্রামী সত্তা।
বৈশাখের তাণ্ডবময় আগমন তাকে ভীত করেনি; বরং সে তাণ্ডবেই তিনি খুঁজে পেয়েছেন উচ্ছ্বাস, উন্মাদনা আর সীমাহীন আনন্দ। তাই তার কবিতায় জেগে ওঠে বিদ্রোহের কালবৈশাখী ঝড়, সাইক্লোনের প্রাবল্য আর অদম্য শক্তির বিস্ফোরণ।

‘ঐ নূতনের কেতন ওড়ে কালবৈশাখীর ঝড়
তোরা সব জয়ধ্বনি কর
তোরা সব জয়ধ্বনি কর
ধ্বংস দেখে ভয় কেন তোর
প্রলয় নূতন সৃজন বেদন
আসছে নবীন জীবন ধারা অসুন্দরে করতে ছেদন
তাই যে এমন কেশে-বেশে
মধুর হেসে
ভেঙে আবার গড়তে জানে সে চির সুন্দর।’
নজরুলের কাছে বৈশাখ যেন এক বিপ্লবীর অস্ত্র—যা বজ্রের মতোই গর্জে ওঠে, দমনের সব বাঁধ ভেঙে। তাঁর সন্ধ্যা কাব্যের ‘কালবৈশাখী’ কবিতায় সেই স্বভাবসিদ্ধ অগ্নিঝরা কণ্ঠে বৈশাখের রুদ্র শক্তি চোখে পড়ে আরও স্পষ্ট হয়ে।

বারেবারে যথা কালবৈশাখী ব্যর্থ হলো রে পুব-হাওয়ায়
ধীচি-হাড়ের বজ্র-বহ্নি বারেবারে যথা নিভিয়া যায়,
কে পাগল সেথা যাস হাঁকি
বৈশাখী কালবৈশাখী!’
কবির আক্ষেপ, বৈশাখ তার প্রকৃত রুদ্ররূপ ধরে আবির্ভূত হয়নি। তাই এখনো বিদেশি শত্রু আমাদের ঘাড়ে বসে আছে। বৈশাখকে তার আহ্বান; এসে যেন শেষ করে দেয় শত্রুদের চিহ্ন :
‘কালবৈশাখী আসেনি হেথায়, আসিলে মোদের তরু-শিরে
সিন্ধু-শকুন বসিত না আসি’ ভিড় করে আজ নদীতীরে।
জানি না কবে সে আসিবে ঝড়
ধূলায় লুটাবে শত্রুগড়।’
হে বৈশাখ
শাহাব উদ্দিন ভূঁইয়া (জয়)
বৈশাখ মানে
ঝড়ো হাওয়া কলি-পুষ্পের মেলা,
বর্ষবরণ ফুলে-ফুলে কত-শত খেলা।
লাল-সাদা রঙ্গে-অঙ্গে বৈশাখীরও রং,
সেজে-বেজে কীর্তনখোলা বাজে ঢং-ঢং।

বৈশাখ মানে
শিশু-কিশোর দোলছে নাগর দোলা,
নীলাকাশে রঙিন ঘুড়ি ছুটাছুটির খেলা।
পান্তা-ভাতে নুনেরছিটে ইলিশ মাছে ভাজা,
স্বজন মিলে ভোজন করে ঐতিহ্যকে খোঁজা।
সামনে আসছে বৈশাখ মাস
কয়েকটা দিন পর,
আম কাঁঠালের পাকা গন্ধে,
মুখরিত হবে ঘর।
কৃষক সবাই ব্যস্ত থাকবে
নিজ নিজ কাজে,
পাকা ধান তুলবে ঘরে
সেই অভিপ্রায় জাগে।
মহাজন ঘরের দেনা পাওনা
মিটিয়ে দেবে সব,
বৈশাখ এসেছে বৈশাখ এসেছে
সবার মুখেই রব।
পুরাতন যত দুঃখ গাঁথা
মুছে ফেলে দাও,
এসো হে বৈশাখ এসো হে বৈশাখ
সেই গান সবাই গাও।
`
নতুনকে করো বরণ
পুরাতন সব ভুলে,
সেই বাসনাই রেখে দাও
মনের মধ্যে তুলে।
নবাগতা বৈশাখ
মোঃ শরীফ উদ্দিন

এলো রে ওই বাদলা বৈশাখ
বাংলা বর্ষের বাঁয়,
নতুন রূপের রঙ ছড়াতে
সবুজ বীথির গাঁয়।
নব পল্লব নিয়ে বৈশাখ
ধরায় এলো রে,
পুরাতন কে ধুয়ে মুছে
রঙ লাগাবে সে।
আরও দেখুন
Books
Books & Literature
বর্ষ সুখে যুবা বৃদ্ধার
লাল সাদা সাট গায়,
নব দীপ্তির আগমনে
পান্তা-ইলিশ খায়।
বৈশাখের ওই পয়লা তারিখ
বরণ্য উৎসব,
নববর্ষে রাখে যেনো
সুখ শান্তি-তে রব।
গাঁও গ্রামে-তে বাজবে সুখে
ডুগডুগির ওই ঢুল,
নৌ জওয়ানীর নৌ আঙিনায়
উড়বে হাওয়ায় ধূল।
হে বৈশাখ

হে বৈশাখ তুমি এলে
নতুন দিনের নব্বারতায়
নব উচ্ছল ও আনন্দ দ্বারায়
নতুন দিনের কুসুম ও কলি
ধরনির বুকে তাই রাঙ্গালে
নব সুখে সৃষ্টিরা হাসে
অনিন্দ্য সুন্দরও উল্লাসে
জাগে নব রূপে বসুন্ধরা
নব দিগন্তের দোয়ার খুলে ঐ
সাজে পত্র পল্লব সজিবতায়
ফুটে পুস্প মল্লিকা অজস্র দ্বারায়
বাজে কত রাগ রাগিণী
নব নবীন হাসে প্রান খুলে
মাঠের বুকে কত বিচিত্রতায়
নতুন ধানের গন্ধ বিলায়
স্বপ্ন ছবি আঁকে কৃষাণেরা
সবুজ আঙ্গিনা ভরিয়ে নিলে
তাই ১লা বৈশাখ এলে

নব নব আনন্দ দ্বারা বহে দিলে ।
কাল বৈশাখী বাংলার বুকে
গুরু গুরু ডাকে
কাল মেঘ পুঞ্জ ঘিরে আকাশটাকে
হটাৎ বহে বায়ু শন শন
বাজে ঘূর্ণি নাছন
লোকালয় তরু দ্বয়ে কাঁপন ধরে
কাঁপে পাতা পত্তর থরথরে
কড় কড় সড়াৎ ক্ষনে পড়ে বাজ
পাহাড়ের গাঁয়ে কভু ভেঙ্গে পড়ে সাজ
বিদ্যুৎ চমকায় এদিক ওদিক
মাঠ ঘাট হতে লোক ছূটে দিক বিদিক
বাড়ি ঘর পাতা খড় ওড়ে টিন চাল
ভেঙ্গে পড়ে হরেক বৃক্ষ লতা ডাল
গরিব নিঃস্বদের নড়ে বড়ে ঘর
ওড়ায় ঘুড়ীর মত , আসে সে খবর
ছিন্ন বিচ্ছিন্ন হয় মাঠের ফসল
দুমড়ে মুচড়ে পড়ে শস্য তরু ফল
ধুয়ার আবেশে ওড়ে শোকনো পাতা
পথিকের উড়ে যায় হাতের ছাতা
পাখীরাও নীড় হারা অশান্ত ডাকে
বাংলার বুকে বজ্রনিনাদ আওয়াজ কাল বৈশাখে ।
